ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: বাতিলের খাড়ায় ২৮ শতাংশ প্রার্থী, ইতিহাসের নতুন বাঁকে বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন যুদ্ধ শুরু হতেই বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন প্রার্থীরা। যাচাই-বাছাই শেষে দেখা গেছে, জমা পড়া মোট মনোনয়নপত্রের ২৮.৩ শতাংশই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৭১.৭ শতাংশ প্রার্থীকে বৈধ হিসেবে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। সারা দেশে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে তিন হাজার ৪০৬টি মনোনয়নপত্র জমা দিলেও লড়াইয়ে টিকে আছেন এক হাজার ৮৪২ জন। বাদ পড়েছেন ৭২৩ জন। এই বিশাল সংখ্যক প্রার্থী বাতিলের ঘটনা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বিষাদময় ঘটনা ছিল সদ্যঃপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার তিনটি আসনে দাখিল করা মনোনয়ন। তিনি মৃত্যুবরণ করায় তাঁর তিনটি আবেদনই যাচাই-বাছাই ছাড়াই কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেছে কমিশন।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনের ময়দানে সক্রিয় হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি আসনে মনোনয়ন জমা দিলেও ৫ জনের আবেদন বাতিল হয়েছে। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও আইনি জটিলতা কাটিয়ে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বৈধতা পেয়েছেন। কিন্তু একই অজুহাতে চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াত প্রার্থীর আবেদন বাতিল হয়েছে।
নির্বাচনের ময়দান থেকে ছিটকে পড়েছেন অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী। জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিবির আবদুল্লাহ ক্বাফী এবং এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি জটিলতায় পড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে তারা রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন। চট্টগ্রামের একটি আসনে দেখা গেছে, মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে যা দেখে রিটার্নিং অফিসাররা বিস্মিত হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে কাজী জাহাঙ্গীরের মনোনয়নপত্র এবারসহ সপ্তমবারের মতো বাতিল হয়ে একটি নেতিবাচক রেকর্ড তৈরি করেছে।
গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মাজেদুর রহমানের মনোনয়ন বাতিলকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রিটার্নিং অফিসাররা একে 'লাভজনক পদ' হিসেবে চিহ্নিত করলেও নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, "এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচন করতে পারবেন, কারণ এটি সরাসরি সরকারি পদ নয়।" এই সিদ্ধান্তের ফলে আপিল বিভাগে অনেক শিক্ষক তাদের প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আশা করছেন।
বাংলার নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ আমলে সীমিত ভোটাধিকার থেকে আজকের সার্বজনীন ভোটাধিকার পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে এই জনপদ। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে যেমন প্রার্থীর আধিক্য ও আইনি লড়াই ছিল, ২০২৫-২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
১৯৭০-এর নির্বাচন ছিল অধিকার আদায়ের, ১৯৯১-এর নির্বাচন ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের, আর ২০২৬ সালের এই নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কারের পরবর্তী সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ১৯০০ সাল থেকে এ দেশের মানুষ সবসময় স্বচ্ছ ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করেছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এই কঠোর অবস্থান বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার আইনগত জটিলতা মূলত ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেরই এক বিবর্তিত রূপ। তবে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে প্রার্থী বাতিলের এই কঠোরতা ২০২৬ সালের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আজ সোমবার থেকে নির্বাচন কমিশনে আপিল শুরু হচ্ছে। কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় প্রার্থীর সমর্থকদের বিক্ষোভ এবং হট্টগোল জানান দিচ্ছে, এবারের নির্বাচন কতটা উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে। বিভাগীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ বাতিল হয়েছে ময়মনসিংহে (১১ আসনে ২৯ জন) এবং ঢাকা মহানগরীতে ৮১ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
তথ্যসূত্র: ১. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়, ২০২৩-২০২৫ স্ট্যাটিসটিকাল রিপোর্ট। ২. বিসিসি বাংলা ও জাতীয় দৈনিক সমূহের অনলাইন আর্কাইভ। ৩. বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |